আসুন চাকরিজীবী মায়েদের প্রতি সহানুভূতিশীল এবং শ্রদ্ধাশীল হই 

yousuf ali



অনেক আগে এটাই প্রচলিত ছিলো যে মায়েরা ঘরে থাকবে আর বাবারা বাইরে কাজ করবে। কিন্তু সময় পাল্টেছে, পুরুষের পাশাপাশি নারীরাও ঘর ছেড়ে পড়ালেখা এবং কাজের উদ্দেশ্যে বাইরের জগতে পা রাখছে। কিন্তু মা হবার কাজটি বিশেষ করে সন্তান জন্মদান এবং তাকে লালন-পালনের বিষয়টি যেহেতু মূলত নারীর উপর তাই নারীদেরকে অনেক বাড়তি চাপের মধ্য দিয়ে যেতে হয়। তেমনি এক চাপ বা আতঙ্ক বা চ্যালেঞ্জের নাম হলো 'কর্মজীবী মা'। মনে প্রশ্ন আসতে পারে আমি এতো নেতিবাচকভাবে কেন বললাম, আমি কি তবে মায়েদের বাইরে কাজ করার বিপক্ষে বলছি? নাহ, মোটেও বিপক্ষে বলছি না। আমি নিজে কর্মজীবী, কিন্তু ব্যক্তিগত জায়গা থেকে এই কর্মজীবী মায়েদেরকে সম্মান এবং সমর্থন করি। আমার কাছে কর্মজীবী মায়েরা সুপার হিরোইন। যেখানে শুধু ঘর সামলাতেই অনেক মায়েরা হিমশিম খায়, সেখানে ঘর-বাহির একসাথে সমান তালে চালিয়ে যাওয়া প্রচন্ড মানসিক শক্তি এবং সাহসের ব্যাপার বলেই আমার কাছে মনে হয়।


কিন্তু এই সুপার হিরোইনরাও কখনো কখনো নিভৃতে কাঁদে। বেশিরভাগ সময়েই এই কান্নার পিছনে থাকে নিজের আত্ম-দহন এবং সমাজসৃষ্ট কিছু ভিলেন। এবারে বলি কি নিয়ে বা কেন এই আত্ম-দহন হয়ে থাকে। আমার মেয়ের বয়স ৩.৫ বছর। ওকে রেখে এখনো কোথাও আমার স্ত্রত ১ ঘন্টার জন্য যেতে হয়নি যেহেতু আমি চাকরি করি তাই ও ঘর সামলায়। কিন্তু আমি মাঝেমাঝেই ভাবি যেসব মায়েরা চাকরি করেন, তারা সকালে উঠে যখন বাচ্চাটিকে রেখে ঘরের বাইরে পা বাড়ায় ঠিক কতোটা ভারী বুক, ভাঙা মন নিয়ে পা বাড়ায়! সারাদিন ওই সন্তানকে রেখে কতো অস্থিরতা কতো কি চিন্তা মাথায় নিয়ে কাজ করেন। মা হওয়ার কারনেই মনটা পড়ে থাকে ঘরে সন্তানের কাছে! সন্তানকে রেখে এই সারাদিন দূরে থাকার কথা ভাবলেই আমার মন হু হু করে উঠে, আর কর্মজীবী মায়েরা তো এইসব আবেগ চেপে বরং কাজ করে যান, করতেও হয় তাদেরকে! এই মায়েরা যখন ক্লান্ত হয়ে বাড়ি ফিরেন তখন প্রায় বিকেল বা সন্ধ্যা। তাই বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই উনাদের মনে হয় উনারা বুঝি সন্তানকে সময় দিতে পারছেন না, সন্তানকে সঠিক যত্ন করতে পারছেন না, উনাদের সন্তানরা হয়তো অন্যদের থেকে পিছিয়ে যাচ্ছে, এমনকি এমন টাও ভাবেন যে উনারা বুঝি স্বার্থপর মা। এই আত্ম-দহন কখনো কখনো হতাশায় রুপ নেয়। যার সবচেয়ে বড় ভিকটিম এই মায়েরা নিজেরা এবং তাদের সন্তানেরা। 


কর্মজীবী মায়েদের ভোগান্তি বা অশান্তি বাড়াতে কিছু সামাজিক ভিলেন তৈরি হয়েই থাকেন। ঘর থেকে শুরু করে কাজে যাবার পুরো পথ, এমনকি কর্মস্থলেও এসব ভিলেনেরা সুযোগ পেলেই মায়েদের শুনিয়ে দেন যে তাদের ঘরে থাকা উচিত, তাদের বাইরে কাজ করার কারণে তাদের সন্তান মানুষ হবেনা সহ এমন আরো কিছু অযৌক্তিক ভয়ংকর সব মন ভাঙা কথা। এসব শুনে আগে থেকেই হতাশ মায়েরা আরো হতাশ হয়ে পড়েন। ফলাফলঃ মায়ের নিজের প্রফেশনাল ক্যারিয়ার আর সন্তানকে মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেন যেন এরা একে অন্যের শত্রু বা বাঁধা। অনেক মায়েরাই এই বুঝাবুঝির দ্বন্দ্বে হার মেনে বাইরের কাজে ইস্তফা দেন। কিন্তু বুকের ভেতর একটা দীর্ঘশ্বাস বয়ে নিয়ে বেড়ান! অন্যদিকে যারা এই লড়াইয়ে টিকে থাকেন উনারাও আহত সৈনিক হিসেবে ক্ষত নিয়েই টিকে থাকেন। যেন দুটো একসাথে সুন্দরভাবে চলতেই পারেনা!! কিন্তু এমনটা কেন হয়? মাতৃত্ব তো একজন নারীর জীবনের অনেকগুলো দিকের একটি দিক, একমাত্র নয়। তাই মাতৃত্বের দোহাই দিয়ে নারীদেরকে অন্য অনেক কিছু থেকে বঞ্চিত করা কতোটা মানবিক, কতোটা যৌক্তিক?!


এবারে কর্মজীবী মায়েদের বলি আপনাদের এমন টা ভাবার কারণ নেই যে আপনারা সন্তানকে সময় দিতে পারছেন না, অন্যরা সারাদিন সময় দেয়, আপনার সন্তান পিছিয়ে যাচ্ছে। ঘরে থাকা মায়েরাই যে সারাদিন বাচ্চাকে কোয়ালিটি টাইম দেয় বা দিতে পারে তা কিন্তু নয়। আপনিও চাইলে আপনার সন্তানকে প্রতিদিন কিছু কোয়ালিটি টাইম দিত পারেন। কিন্তু এক্ষেত্রে কর্মজীবী মায়েরা অনেকেই বুঝতে পারেন না কীভাবে সন্তানকে এই সময় দিবেন, তাই কিছু ছোটখাটো টিপস যা কাজে দিতে পারেঃ


১। আজ থেকে আর হতাশা নয়, আপনি কাজ করছেন, এতে লজ্জার কিছু নেই। আপনার এই কাজের সুফল আপনার সন্তান থেকে শুরু করে আপনার পরিবার, দেশ, জাতি পাবে। কাজেই আজ থেকে আত্ম-বিশ্বাসের সাথে মাথা উঁচু করে কাজ করুন। আপনি যে একই সাথে এতোগুলো ভূমিকা পালন করতে পারেন, এটা আপনার বিশেষ যোগ্যতা।


২। আপনার অফিসের সময়টুকু আপনার সন্তান কার কাছে থাকবে, কিভাবে থাকবে, কি খাবে, কি করবে এগুলো আগে থেকেই সুন্দরভাবে গুছিয়ে ঠিক করে রাখা ভালো। সন্তানের নিরাপত্তাকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দেয়া উচিত এইসব বিষয়ে। আপনি চাইলে লিখে রেখে যেতে পারেন ওর সারাদিনের রুটিন যাতে ওকে যে বা যারা দেখবে উনাদের সব ঠিকঠাকভাবে করতে সুবিধা হয়।  

 

৩। আপনার সারাদিনের রুটিনে একটা নির্দিষ্ট সময় রাখা যা সম্পূর্ণরূপে আপনার সন্তানকে দিবেন। সেটা হতে পারে অফিস থেকে ফিরে আপনার রেস্ট নেয়ার পর, আবার হতে পারে রাতের খাবারের পর ঘুমের আগে। এই সময়ে ওকে বয়স অনুযায়ী গল্প শোনাতে পারেন, ওর সাথে বই পড়তে পারেন বা কিছু শেখানোর চেষ্টা করতে পারেন। এক কথায় যেমনটি আপনার সন্তানের দরকার। 


৪। সকালে অফিসে যাওয়ার সময় সন্তানকে আদর করে, ভালোবেসে বুঝিয়ে রেখে যাবেন। ফিরে এসে ওর সাথে অনেক মজা করবেন এটাও জানিয়ে যেতে পারেন। তাতে ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়বে কম। ধীরে ধীরে আপনার সন্তান আপনার এই রুটিনে মানিয়ে নিতে শিখে যাবে। 


৫। কাজ থেকে বাড়ি ফিরে হাসিমুখে সন্তানের সাথে কথা বলুন, সারাদিন ওর কেমন গেলো, কি কি করলো জানতে চান, সাথে আপনারটাও শেয়ার করুন। এতে করে আপনাদের মধ্যে শেয়ারিং এর একটা অভ্যাস তৈরি হবে এবং সে নিজেকে গুরুত্বপূর্নও ভাববে যে মা তার সাথে কতো কিছু বলছে। কথার ফাঁকে ফাঁকে ওকে জানিয়ে দিন আপনি সারাদিন ওকে কতো মিস করেছেন। 


৬। ছুটির দিনগুলোতে ওকে পর্যাপ্ত সময় দিন। আমাদের দেশের বেশিরভাগ মানুষেরই ছুটির দিনগুলো এলোমেলো কাটে। কিন্তু আপনার যেহেতু সপ্তাহের ৫-৬ দিন কাজে ব্যস্ত থাকতে হয় সন্তানকে কাছে পান কম, তাই ছুটির দিনগুলোর জন্য অবশ্যই আগে থেকে সুন্দর করে পরিকল্পনা করে রাখতে পারেন এবং সে অনুযায়ী কাটাতে পারেন। 


৭। বয়স উপযোগী করে আপনার সন্তানকে আপনার কাজ, চ্যালেঞ্জ, ডেভেলপমেন্ট সম্পর্কে বলুন। এতে করে সে বয়সের সাথে সাথে আপনার কর্মজীবনের দায়িত্বের বিভিন্ন দিক বুঝতে এবং সম্মান করতে শিখবে, একই সাথে একটু একটু করে সেও প্রফেশনালিজম সম্পর্কে জানবে, শিখবে।  


৮। আপনার কাজ বা প্রফেশনাল বিষয় নিয়ে সন্তানের সামনে খেদ প্রকাশ করবেন না। এতে ওর মনে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। আপনার এই কাজ করাকেও সে একটা সময়ে অসম্মান করে বসতে পারে। আর কাজকে যে ভালোবাসতে হয়, সম্মান করতে হয় সেটাও তো সে আপনার কাছ থেকেই শিখবে।


৯। সুযোগ পেলেই বা সুযোগ করে নিয়ে সন্তানের সাথে অনেক অনেক ফান করুন, হাসুন। এতে আপনার স্ট্রেসও রিলিজ হবে এবং একই সাথে আপনার সন্তানের সাথে আপনার দারুন সম্পর্ক তৈরি হবে। 


সন্তান, কর্ম, ঘর সবই আপনার জীবনের অংশবিশেষ। আপনাকেই ভালোবেসে, আত্ম-বিশ্বাসী হয়ে এগুলো ম্যানেজ করতে হবে। আপনি তা পারছেন, পারবেনও। এটাই আপনার বিশেষত্ব। আজ আপনার সন্তানের সাথে সারাদিন থাকতে পারছেন না বলে মন খারাপ করলেও, ভবিষ্যতে আপনার সন্তানই আপনাকে নিয়ে হয়তো গর্ব করবে। 


সকল কর্মজীবী মায়েদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং ভালোবাসা রইলো।